আমিরুল ইসলাম অল্ডাম মেহেরপুর প্রতিনিধি: পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, পূজার ঘণ্টা, ঢাকের তাল, ধূপ-ফুলের অঞ্জলি আর ভক্তদের প্রার্থনায় দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হয়েছে। ছয় দিনের পূজার আনন্দ শেষে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে মেহেরপুরে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। আনন্দের মাঝে ছিল বিদায়ের বিষাদ, আর সেই সঙ্গে আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের প্রত্যাশা।
বুধবার সকালে মেহেরপুরের শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, শ্রী শ্রী হরি ভক্তি প্রদায়িনী পূজা মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রদীপ জ্বালিয়ে, ধূপ-ফুল, বেলপাতাসহ বিভিন্ন উপাচারে দেবীর চরণে শেষবারের মতো অর্ঘ্য নিবেদন করেন ভক্তরা। প্রার্থনায় পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সবার সুস্থতা এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন তাঁরা।
পরে দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিজয়া দশমীর শাস্ত্রীয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এরপর দেবীকে সিঁদুর দিয়ে বরণ এবং সিঁদুর খেলার আয়োজন করা হয়। এ সময় ভক্তরা দেবীর কপালে ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। পরে একে অপরের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন। লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, হাসি আর বিদায়ের আবেগে মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
দুপুরের পর মেহেরপুর শহরের শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, শ্রী শ্রী নায়েববাড়ি রাধামাধব মন্দির, শ্রী শ্রী হরি ভক্তি প্রদায়িনী পূজা মন্দির, শ্রীশ্রী বকুলতলা পূজামন্দির, শ্রীশ্রী হরিজন বালক পূজা মন্দির, গোভীপুর রায়পাড়া দুর্গাপূজা মণ্ডপ, শ্রী শ্রী দাসপাড়া মন্দির ও শ্রী শ্রী রাধামাধব মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা বের করা হয়।
ঢাকের তালে তালে নাচ-গান ও উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রাগুলো শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ভৈরব নদের তীরে গিয়ে শেষ হয়। সন্ধ্যার পর নদে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় ভৈরব নদের দুই পাড়ে শত শত উৎসুক মানুষ ভিড় জমান। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় মেহেরপুরের শারদীয় দুর্গোৎসব।
উৎসবমুখর পরিবেশে মহানবমীর পূজা-অর্চনা শেষে আজ বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমী উদযাপন করছেন মেহেরপুরের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রতিমা বিসর্জন, সিঁদুর খেলা ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব।
গতকাল মঙ্গলবার মহানবমীতে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবীর পূজা, অঞ্জলি প্রদান ও প্রসাদ বিতরণসহ নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। সকাল থেকেই মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের আনাগোনা ছিল। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিমা দেখতে আসেন নানা বয়সী মানুষ। আজ বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গাকে বিদায়ের প্রস্তুতি /প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের দুর্গোৎসব।
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মেহেরপুরের বিভিন্ন মণ্ডপে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী মানুষের ভিড় দেখা গেছে। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি অনেকে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবে অংশ নিচ্ছেন।
পূজা দেখতে আসা সুস্মিতা বলেন, “প্রতিমা দেখতে এসে খুব ভালো লাগছে। মণ্ডপগুলো সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে পূজার আনন্দ উপভোগ করেছি।”
পায়েল বিশ্বাস বলেন, “দুর্গাপূজা আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছরই পূজা দেখতে আসি। সবার মধ্যে আনন্দ-উৎসাহ দেখে খুব ভালো লাগছে।”
অর্পিতা মণ্ডল বলেন, “এবারের পূজার পরিবেশ খুবই সুন্দর। বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে প্রতিমা দেখেছি। আজ বিজয়া দশমী, তাই আনন্দের পাশাপাশি দেবীকে বিদায় জানানোর সময় মনটাও খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”
সৌরভ বলেন, “পূজামণ্ডপে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি। নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে প্রতিমা দেখতে পারছি।
চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের তত্ত্বাবধানে মেহেরপুর ও পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গার সীমান্তবর্তী ২৪টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ১২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন।
মেহেরপুরের পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, “মেহেরপুরের পূজামণ্ডপগুলোয় উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হয়েছে। আমরা বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখছি এবং কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উৎসবকে আরও আনন্দমুখর করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ করেছি।”
এ বছর মেহেরপুরের তিন উপজেলায় মোট ৪৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মেহেরপুর সদর উপজেলায় ১৫টি, মুজিবনগর উপজেলায় ৮টি এবং গাংনী উপজেলায় ২১টি মণ্ডপ ।
বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি উৎসবের এই শেষ দিনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।
