মনোরঞ্জন চন্দ্র রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধ, কেমিক্যাল, যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মালামাল সরবরাহ ও গ্রহণ, চালানপত্র সংরক্ষণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি না থাকা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
অভিযোগ উঠেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোরকিপার সাদেকুল ইসলাম ছুটির দিনে তড়িঘড়ি করে চালান ছাড়াই চিকিৎসা সরঞ্জাম হাসপাতালের স্টোরে জমা নিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ- স্টোরকিপার সাদেকুলের যোগসাজশে পরিমাণে কম চিকিসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে কাগজে কলমে দেখানো হবে সঠিক, বাস্তবে হবে উল্টো চিত্র।
সরেজমিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার (২০অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে একটি ট্রাকে করে টেন্ডারকৃত কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়। পরে সেগুলো স্টোররুমে রাখা হয়। এ সময় স্টোরকিপার সাদেকুল ইসলামের কাছে মালামাল সরবরাহের চালানপত্র দেখতে চাওয়া হলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। ছুটির দিনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির সদস্যদের উপস্থিতি ছাড়া কীভাবে মালামাল গ্রহণ করা হচ্ছে, সে প্রশ্নেও তার কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
কাজেই টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী মালামাল সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, পণ্যের পরিমাণ ও মান যথাযথভাবে যাচাই করা এবং গ্রহণপ্রক্রিয়া বিধিসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় ও সরেজমিন তথ্যে জানা যায়, নওগাঁ শহরের উকিলপাড়ার ঠিকাদার শফিকুল আলম টেন্ডারের মাধ্যমে রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের মোট মূল্য নিয়ে রয়েছে ভিন্ন বক্তব্য। স্থানীয়ভাবে প্রায় ৬০ লাখ টাকার টেন্ডারের কথা বলা হলেও ঠিকাদার শফিকুল আলমের দাবি- টেন্ডারের প্রকৃত মূল্য ৪৫ লাখ টাকা।
তবে টেন্ডারের মূল্য জানেন না স্টোরকিপার, আর সঠিক তথ্য দিতে পারেননি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। কাজেই টেন্ডারের প্রকৃত মূল্য, সরঞ্জামের তালিকা এবং কত টাকার মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে এসব যাচাই করার দাবি উঠেছে।
নিয়ম অনুযায়ী- সরকারিভাবে কোনো সরঞ্জাম ক্রয় করা হলে সেক্ষেত্রে কার্যাদেশ, চুক্তির শর্ত, পরিমাণ, মডেল, ব্র্যান্ড, মান ও অন্যান্য শর্ত যাচাই করতে হয়। কিন্তু রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্ষেত্রে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে মানা হয়নি বিধিসম্মত নিয়মনীতি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতাল এলাকার স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এগুলো সংরক্ষণযোগ্য সরঞ্জাম। টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী সব মালামাল একবারে সরবরাহ করার কথা থাকলে তা কয়েক ধাপে কিংবা ছুটির দিনে আনার কারণ কী, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। তাদের প্রশ্ন- স্টোরকিপারের কাছে চালানের কাগজপত্র থাকবে না কেন? হাসপাতালের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে মালামাল বুঝে নিলেন না কেন? এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
মালামাল গ্রহণের বিষয়ে রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোরকিপার সাদেকুল ইসলাম বলেন, কত টাকার মাল আমার জানা নেই। মালগুলো ১৯ তারিখে আসার কথা ছিল। আরও মালামাল আসবে। তবে ঊর্ধ্বতনের অনুমতি সাপেক্ষে আমি মালগুলো স্টোরে জমা রেখেছি। আর সব মালামাল স্টোরে জমা হওয়ার পর তালিকা করে ঊর্ধ্বতন স্যারদের কাছে জমা দেব। পরে স্যারেরা টিম অনুযায়ী সেগুলো পরিদর্শন করবেন। চালানপত্র দেখতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আমার কাছে নেই, বাসায় রেখে এসেছি। যোগসাজশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি কেউ বলে থাকে, তাহলে কিছু করার নেই। কারণ এগুলো মিথ্যে ও ভিত্তিহীন।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার শফিকুল আলম বলেন, কয়েক ধাপে মালামাল সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। সরকারি ক্রয়চুক্তির শর্তে অনুমতি থাকলে তা করা যেতে পারে। আর ৬০ লাখ নয়, মোট ৪৫ লাখ টাকার টেন্ডার। কয়েক ধাপে সব মালামাল আসবে। এর আগে একবার কিছু মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে কিছু মালামাল ঢাকা থেকে এসেছে। পূজার ছুটির পর বাকি মালামাল আসবে। এখানে কোনো লুকোচুরির কিছু নেই। নিয়ম অনুযায়ীই আমরা কাজ করছি।
জানতে চাইলে রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খান বলেন, কয়েক ধাপে মালামাল সরবরাহ করতে পারবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। স্টোরকিপার মালামাল বুজে নিয়েছে। পরবর্তীতে আমরা সেগুলো দেখে বুজে নেব। আপনারা চাইলে পরে এসে সব দেখে যেতে পারেন।
তবে মালামাল গ্রহণের সময় কী কী নথি প্রস্তুত করা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী কতটুকু মালামাল বুজে নিয়েছেন এবং চূড়ান্ত যাচাইয়ের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসবের উত্তর পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, রাণীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেন্ডার বা সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে আমি অবগত নই, বা জানার কথাও নয়। আপনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন। এসব বিষয়ে আমার জানা নেই।
