মাইনুল ইসলাম রাজু, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি: বরগুনার আমতলী উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি রাজস্বের ভ্যাট, আয়কর, ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্সের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্ব হস্তান্তরে গড়িমসি, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে নেওয়া, স্বাক্ষরসংক্রান্ত অনিয়ম ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও আনা হয়েছে। এসব ঘটনায় বরগুনা জেলা প্রশাসক ও আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের নির্দেশে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের (ডিডিএলজি) কাছে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে।
আঠারগাছিয়া ও গুলিশাখালী ইউনিয়নে রাজস্ব জমা না দেওয়ার অভিযোগ
বরগুনা জেলা প্রশাসক বরাবর দাখিল করা লিখিত অভিযোগে ৩ নম্বর আঠারগাছিয়া ও ১ নম্বর গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রাজিবুল ইসলাম উল্লেখ করেন, গত ২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তিনি আঠারগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদে অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদে মূল দায়িত্ব নিয়ে যোগদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর পূর্ববর্তী সময়ের বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের তথ্য তাঁর নজরে আসে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, আঠারগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করের (১ শতাংশ) বরাদ্দ করা ১৪ লাখ ৯৯ হাজার ৮১২ টাকার বিপরীতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৭১ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স থেকে আদায় করা ৬৫ হাজার ৮০০ টাকার বিপরীতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ৯ হাজার ৮৭০ টাকাও ব্যাংকে জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করের (১ শতাংশ) ১২ লাখ ১ হাজার ৯১৭ টাকার বিপরীতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ১ লাখ ৮০ হাজার ২৫৭ টাকা এবং হাটবাজার তহবিলের ৫ লাখ ৬০ হাজার ৫৯৬ টাকার বিপরীতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৮৪ হাজার ৮৯ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিষদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথিপত্র নিয়মবহির্ভূতভাবে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রাজিবুল ইসলাম।
দায়িত্ব হস্তান্তরে গড়িমসি ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে রাজিবুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারলেও প্রাতিষ্ঠানিক আদেশ অনুযায়ী ৭ এপ্রিলের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি জাকির হোসেন। বরং দিনের পর দিন তাঁকে ঘোরানো হয় এবং মুঠোফোন বন্ধ রাখা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ২৬ এপ্রিল দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় জাকির হোসেন তাঁকে উদ্দেশ করে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি বলেন, “তোমার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কথায় কি আমাকে চার্জ হস্তান্তর করাতে পারছো?”
এ ছাড়া দীর্ঘদিন একই উপজেলায় চাকরি করার সুবাদে অন্য কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের প্ররোচিত করে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বিঘ্নিত করার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আমতলী ইউনিয়ন পরিষদেও ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্সের অর্থ নিয়ে অভিযোগ
অন্যদিকে, ৬ নম্বর আমতলী ইউনিয়ন পরিষদেও জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্সের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও ৬ নম্বর আমতলী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. মনজুরুল হক কাওছার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগ করেন, জাকির হোসেন দুই শতাধিক ব্যক্তিকে ট্রেড লাইসেন্স দিলেও পরিষদের রেজিস্টার খাতায় মাত্র ৯০ জনের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাকি ব্যক্তিদের তথ্য রেজিস্টারে পাওয়া যায়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া প্রশাসকের স্বাক্ষর না নিয়ে অবৈধভাবে ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যের স্বাক্ষর গ্রহণ এবং গত পাঁচ মাসে আদায় করা ট্যাক্সের অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাকির হোসেন দুর্ব্যবহার করেন। এ সময় তিনি বলেন, “আমার চাকরির ৩২ বছর জীবনে কখনো ট্যাক্স এবং ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বাবদ টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা দিইনি, এই টাকার একমাত্র অধিকার সচিবের।”
এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় বা ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে হেয়প্রতিপন্ন করার অভিযোগও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগগুলো তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, সরকারি রাজস্বের অর্থের হিসাব নিরূপণ, অনিয়ম প্রমাণিত হলে অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের বক্তব্য জানা যায়নি। তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
