সবুজ হোসেন, নওগাঁ:নওগাঁর আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ-শাহাগোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সাংবাদিককে আর্থিক সুবিধা দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টাসহ নানা অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে মান্দা উপজেলার নুরুল্লাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়েছে। একাধিক দফায় সংবাদ প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগের আলোচনা এবং শোকজের পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পর্যায়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সূত্রে তাঁর বদলির বিষয়টি জানা গেছে। তবে বদলির আদেশের স্মারক নম্বর, তারিখ এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, মোস্তাফিজুর রহমান আত্রাইয়ে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। এসব অভিযোগ নিয়ে ক্রাইম টেলিভিশনে পরপর তিনবার সংবাদ প্রচার করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন প্রাইম টেলিভিশনেও এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর প্রশাসনিক পর্যায়ে নড়াচড়া শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর তাঁকে শোকজ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে আত্রাই থেকে মান্দার নুরুল্লাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়।
এর আগে, জমির খাজনা পরিশোধ করতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ এনে নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন আত্রাইয়ের বাসিন্দা মো. লুৎফর রহমান। তাঁর অভিযোগ, জমির খাজনা পরিশোধের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে ১২ হাজার টাকা দিলেও তাঁকে ৩ হাজার ৬০০ টাকার অনলাইন রসিদ দেওয়া হয়। বাকি ৮ হাজার ৪০০ টাকা কোন খাতে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি বলে আবেদনে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং সরকারি সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও সামনে আসে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে নওগাঁ, রাণীনগর ও দুপচাঁচিয়া এলাকায় একাধিক বাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ জমি থাকার অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের পরিমাণ এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ছাড়া তাঁর স্ত্রীর চাকরি পাইয়ে দিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সম্পদের দলিল, আয়কর নথি, চাকরির নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব পাওয়ার অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক মো. সবুজ হোসেন। এ বিষয়ে তিনি নওগাঁ জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়, কর্মকর্তার পক্ষে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন এবং আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত মাসিক অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এ-সংক্রান্ত ফোনকল, বার্তা ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষিত রয়েছে বলেও অভিযোগকারী দাবি করেছেন।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরপর সংবাদ প্রচার, লিখিত অভিযোগ এবং শোকজের পর অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে অন্য একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হলেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্তের ফল কী তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, অভিযোগগুলো গুরুতর হলে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করে বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা জনসমক্ষে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
তবে শুধু বদলি হওয়াকে অপরাধের প্রমাণ বা অভিযোগের নিষ্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক লেনদেন যাচাই এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ, সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ যাচাই এবং দালালদের প্রভাবমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং বিভাগীয় তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা জানা গেলে প্রতিবেদনে তা সংযোজন করা হবে।
