বিশ্বজিৎ সিংহ রায় স্টাফরিপোর্টার ( মাগুরা)নদীর বুকে ছুটছে বাইচের রঙিন নৌকা, ছন্দ মিলিয়ে পড়ছে মাঝিদের দাঁড়। কখনো কখনো মাঝিদের সম্মিলিত ‘হেঁইও’ টং টং ধ্বনি-সব মিলিয়ে নবগঙ্গার শান্ত জলরাশি যেন হঠাৎই প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নদীর দুই কূলে তখন মানুষের ঢল। কেউ দাঁড়িয়ে তীরে, কেউ উঁচু জায়গায়, আবার কেউ বেরইল-পলিতা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন বাংলার চিরায়ত নৌকাবাইচ। মাগুরা সদরের বেরইল-পলিতা নৌকা বাইচ মেলা কমিটি ও স্থানীয়দের আয়োজনে
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) মাগুরা সদর উপজেলার ১১ নম্বর বেরইল-পলিতা ইউনিয়নের বেরইল-পলিতা বাজারসংলগ্ন নবগঙ্গা নদীতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ও গ্রামীণ লোকজ মেলা। বিকেলে বাইচ শুরু হওয়ার আগেই নদীর দুই কূলে জমতে শুরু করেন দর্শনার্থীরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। বাইচ শুরু হলে মুহূর্তেই উৎসবের রূপ নেয় পুরো নদীপাড়।
মাঝিদের শক্ত হাতে দাঁড়ের টানে কখনো নৌকা ছুটে যায় সামনের দিকে, আবার কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার সঙ্গে তৈরি হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। নৌকার গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুই পাড় থেকে ভেসে আসে করতালি ও উচ্ছ্বাস।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য তৈরি হয় বেরইল-পলিতা সেতুকে ঘিরে। সেতুর ওপরও দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজে নেন দর্শনার্থীরা। দূর থেকে নদীর বুকের নৌকাগুলোর ছুটে চলা দেখতে সেতুটি যেন পরিণত হয় প্রাকৃতিক গ্যালারিতে। নিচে নবগঙ্গার জল, মাঝখানে ছুটে চলা নৌকা আর ওপরে মানুষের ভিড়-পুরো দৃশ্যটি ধারণ করে গ্রামবাংলার এক অনন্য উৎসবের ছবি।
শুধু সেতু নয়, নদীর দুই তীরে ও আশপাশের উঁচু স্থানগুলোতেও ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ,বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন নৌকাবাইচ দেখতে।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে বেরইল পলিতা বাজার ও আশপাশের এলাকায় বসে গ্রামীণ মেলা। বিভিন্ন দোকানে সাজানো হয় খাবার, খেলনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, গ্রামীণ কারুশিল্পসহ নানা পণ্যের পসরা। ফলে নদীর বাইচের পাশাপাশি মেলাতেও ছিল মানুষের সরব উপস্থিতি।
স্থানীয়রা জানান,
মাগুরা, মহম্মদপুর, শালিখা, শ্রীপুর, নড়াইল, ঝিনাইদহ ও বোয়ালমারীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ নৌকাবাইচ দেখতে আসেন। কারও হাতে মোবাইল ফোন, কেউ আবার দূর থেকে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন নৌকার প্রতিযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে অনেকে ধারণ করেন ছবি ও ভিডিও।
স্থানীয়দের কাছে নৌকাবাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়,এটি নদী ও মানুষের সম্পর্কের পুরোনো এক স্মৃতি।
একসময় বাংলার নদ-নদীতে বর্ষা এলেই নৌকাবাইচকে ঘিরে বসত উৎসব। নদীর দুই পাড়ে জড়ো হতেন নানা বয়সী মানুষ। নৌকার সঙ্গে সঙ্গে ছুটত মানুষের আনন্দ, হাসি আর উচ্ছ্বাস।
আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের ভিড়ে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। তাই নবগঙ্গার বুকে এমন আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে নতুন আগ্রহ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ সংস্কৃতির এই পুরোনো আয়োজনকে পরিচিত করে তুলেছে।
বিকেলের আলো যখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, নবগঙ্গার জলে তখনও প্রতিযোগিতার উত্তাপ। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে নৌকার ছন্দ আর দুই তীরের মানুষের উচ্ছ্বাস মিলে তৈরি হয় এক অপূর্ব দৃশ্য। মনে হয়, কয়েক ঘণ্টার জন্য সময় যেন পেছনে ফিরে গেছে-ফিরে এসেছে নদীমাতৃক বাংলার সেই চেনা দিন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে নৌকাবাইচ ও লোকজ মেলার আয়োজন করা হলে নবগঙ্গাকে ঘিরে তৈরি হতে পারে একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক উৎসবের পরিবেশ। এতে একদিকে যেমন গ্রামীণ ঐতিহ্য সংরক্ষণ হবে,অন্যদিকে নদীকেন্দ্রিক মানুষের সামাজিক বন্ধনও আরও দৃঢ় হবে।
