সবুজহোসেন, নওগাঁ:নওগাঁর রানীনগরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যাংকের তিন কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। এ সময় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল, একটি আইফোনসহ সাতটি মোবাইল ফোন জব্দ এবং লুণ্ঠিত টাকার মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, অনলাইন জুয়ায় বিপুল পরিমাণ টাকা হারানোর পর ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে ছিনতাইয়ের নাটক সাজানো হয়। এ ঘটনায় ব্যাংকের তিন কর্মীসহ অন্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও বাকি টাকা উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্যাশিয়ার নাজমুল ও অফিস সহায়ক রাসেল আদমদীঘি রেলগেট এলাকা থেকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মালিক ফিরোজ হোসেনের কাছ থেকে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে আবাদপুকুর বাজারের অফিসের উদ্দেশে রওনা হন। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে রানীনগর থানার পারইল বাজার পার হয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল তাদের পথরোধ করে। এ সময় লোহার পাইপ দিয়ে নাজমুলকে মারধর করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
ঘটনার খবর পেয়ে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম দ্রুত ব্যবস্থা নিতে রানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তাঁর তত্ত্বাবধানে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক হাসিবের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। ডিবি ও রানীনগর থানা-পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ শুরু করে।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন রাতেই ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয় এবং এর মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ৭ অক্টোবর রাতে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পরে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্বপন (২৮) ও হাসান আলীকে (২৫) গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত টাকার মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবর রানীনগর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আরও তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন—অফিস সহায়ক রাসেল বাবু (২২), ঋণ কর্মকর্তা সুজন (২৭) ও ঋণ কর্মকর্তা আবু তালেব (২২)। তাঁদের বাড়ি রানীনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে জানা যায়, গ্রেপ্তার তিন ব্যাংককর্মী রাসেল বাবু, সুজন ও আবু তালেব কয়েক মাস ধরে অনলাইন জুয়ায় অংশ নিয়ে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারান। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা বিভিন্ন গ্রাহকের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে অনলাইন জুয়ায় ব্যবহার করেন। পরে ওই অর্থের ঘাটতি আড়াল করতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মালিক ফিরোজ হোসেনের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রায় এক মাস ধরে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ঘটনার দিন রাসেল বাবু ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আনতে যান। টাকা নিয়ে ফেরার পথে তিনি ফোনে ছিনতাইকারীদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য জানাতে থাকেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, পারইল বাজারসংলগ্ন বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে স্বপন, হাসানসহ পলাতক কয়েকজন তাঁদের পথরোধ করেন। এ সময় নাজমুলকে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যান তাঁরা। তদন্তে পুলিশ মনে করছে, ক্যাশিয়ার নাজমুল প্রকৃত ভুক্তভোগী হলেও অফিস সহায়ক রাসেল বাবু ছিনতাইয়ের ঘটনাটিকে বাস্তব বলে দেখানোর পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন।
পুলিশ আরও জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩৪ লাখ টাকার একটি অংশ ব্যাংকের তিন কর্মীর পাওয়ার কথা ছিল এবং বাকি টাকা অন্যদের মধ্যে ভাগ হওয়ার কথা ছিল। ছিনতাইয়ের পর স্বপন ও হাসানকে প্রাথমিকভাবে দেড় লাখ টাকা দিয়ে নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বাকি টাকা উদ্ধারে পুলিশের অভিযান ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এ ঘটনায় আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
