মোঃ আকতারুজ্জামান রানা পীরগঞ্জ (রংপুর)প্রতিনিধিঃ মাদ্রাসা শিক্ষা কেবল একটি শিক্ষাব্যবস্থা নয়; নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, কুরআন-হাদিসের জ্ঞান এবং আধুনিক সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে একজন শিক্ষার্থীকে আদর্শ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে আমাদের দেশের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধনির্ভর সমাজে মাদ্রাসা শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চিত্র গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষার ফলাফল সেই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পীরগঞ্জ উপজেলার ৫২টি মাদ্রাসা থেকে এবার ১ হাজার ১২০ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২২১ জন। অর্থাৎ পাসের হার মাত্র ১৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সংখ্যাটি শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়—এটি উপজেলার মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের নানা অসংগতির একটি বড় সতর্কসংকেত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১০টি মাদ্রাসা থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল ১৬৪ জন। অর্থাৎ ১৬৪ জনের প্রত্যেকেই অকৃতকার্য হয়েছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই রয়েছে বহুতল একাডেমিক ভবন, বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা।
ছাতুযা দাখিল মাদ্রাসায় ২৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে কেউ পাস করেনি। অথচ সেখানে বহুতল একাডেমিক ভবন এবং ২৩ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে। অনন্তরামপুরে ১৬ জন, খেজমতপুর এমাজিয়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসায় ১৬ জন, মদনখালী কোচারপাড়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসায় ১৬ জন, বড়আলমপুর আবুল হোসেন দাখিল মাদ্রাসায় ১৯ জন, কুমুরসইয়ে ১১ জন, পত্নীচড়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসায় ২৬ জন, জুনিদপুর নায়েবিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ৫ জন, ছোট উজিরপুর বালিকা দাখিল মাদ্রাসায় ১৫ জন এবং গন্ধর্বপুর দাখিল মাদ্রাসায় ১৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েও কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি।
এখানেই শেষ নয়। আরও ১১টি মাদ্রাসায় ১৭৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১১ জন। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানেও ফলাফল প্রায় বিপর্যস্ত। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ১৪, ১৭, ২৩ কিংবা তারও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েও পাস করেছে মাত্র একজন।
অন্যদিকে সাতটি মাদ্রাসায় ১৩৮ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৪ জন। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পাসের সংখ্যা তিন, চার, পাঁচ বা ছয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠানের একসময় শতভাগ পাসের রেকর্ড ছিল, সেখানেও এবার ফলাফলের বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে।
ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—এত শিক্ষক-কর্মচারী, এত ভবন, এত সরকারি সুবিধা, এত অবকাঠামো থাকার পরও শিক্ষার্থীদের ফলাফল এত খারাপ কেন?
পীরগঞ্জের ৫২টি মাদ্রাসায় শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩০০-এরও বেশি বলে জানা গেছে। অর্থাৎ পরীক্ষার্থীর চেয়েও শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা বেশি। সংখ্যার এই বৈপরীত্য শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য যেখানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, সেখানে শিক্ষক-কর্মচারীর বিপুল উপস্থিতির বিপরীতে শিক্ষার্থীদের এমন ফলাফল কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে পারে না।
অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের কাছ থেকে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে মেধার পরিবর্তে অর্থের প্রভাব কাজ করেছে। কোথাও কোথাও প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির যথাযথ অনুসরণ হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, মাদ্রাসা শিক্ষার ভবিষ্যতের জন্যও ভয়াবহ।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—কিছু প্রতিষ্ঠান কেবল এমপিওসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা ধরে রাখার জন্য উচ্চ শ্রেণির শিক্ষার্থী এনে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধন করিয়ে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করায়। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষার্থী সংখ্যা পূরণ করা হয়। এবার পরীক্ষার হলে সিসি ক্যামেরার নজরদারি থাকায় এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ কমে যাওয়ায় প্রকৃত চিত্র ফলাফলে ফুটে উঠেছে—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। অভিযোগকে সত্য ধরে নিয়ে কাউকে দায়ী করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি গুরুতর অভিযোগকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
ছোট উজিরপুর বালিকা দাখিল মাদ্রাসাকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলো আরও উদ্বেগজনক। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস ও পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই; অথচ বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থী এনে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো হতো। এবার ১৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েও কেউ পাস করেনি। একই এলাকায় সরকারের মাসিক ভাতা-ভোগী একটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসাকেও ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টভাবে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ও যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পীরগঞ্জে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠাকালীন সরকারি নীতিমালা ও নির্ধারিত দূরত্ব যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই এলাকায় কাছাকাছি একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আর শিক্ষার্থী সংকট যখন প্রকট হয়, তখন অনেক প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে টিকে থাকলেও বাস্তবে শিক্ষা কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে সব মাদ্রাসাকে একই পাল্লায় মাপা যাবে না। পীরগঞ্জের কিছু মাদ্রাসা এখনও ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। জাফরপাড়া দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসায় ৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৭ জন পাস করেছে এবং পাঁচজন জিপিএ-৫ পেয়েছে। মাদারগঞ্জ ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসায় ৪৭ জনের মধ্যে ২২ জন পাস করেছে, জিপিএ-৫ পেয়েছে দুজন। রাধাকৃষ্ণপুর নেজামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ২৪ জনের মধ্যে সাতজন পাস করেছে এবং একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে। পীরগঞ্জ ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় ২৭ জনের মধ্যে ছয়জন পাস করেছে, সেখানেও একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
মথুরাপুর দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসার সুপার রাজা মিয়ার বক্তব্যও এখানে প্রাসঙ্গিক। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মোট ৬৯ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই পাস করেছিল এবং ১২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে ২২ জনের মধ্যে মাত্র আটজন পাস করেছে। তিনি এটিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে আগামীতে ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
অর্থাৎ সমস্যা সমাধানের পথ এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং এখনই প্রয়োজন সঠিক রোগ নির্ণয় এবং কার্যকর চিকিৎসা।
পীরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, শতভাগ ফেল করা মাদ্রাসার সুপারদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে এবং ফলাফল বিপর্যস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানও ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান, একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এ উদ্যোগ অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। কিন্তু শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
প্রথমত, শতভাগ ফেল করা এবং ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একাডেমিক অডিট করতে হবে। গত কয়েক বছরের ফলাফল, শিক্ষার্থী উপস্থিতি, শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রম, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যাবতীয় তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীর প্রকৃত উপস্থিতি, নিবন্ধন ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাই করা যেতে পারে।
চতুর্থত, যেসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই এবং বছরের পর বছর ফলাফল অত্যন্ত খারাপ, সেসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। প্রয়োজন হলে পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূতকরণ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কিংবা কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, শুধু ভবন নির্মাণকে শিক্ষার মানোন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একটি সুন্দর বহুতল ভবন তখনই অর্থবহ, যখন তার শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান হয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকে এবং শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান অর্জন করে।
সবচেয়ে বড় কথা, মাদ্রাসা শিক্ষাকে শুধু এমপিও, বেতন-ভাতা কিংবা অবকাঠামোর হিসাবের মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। মাদ্রাসার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো এমন প্রজন্ম তৈরি করা, যারা ধর্মীয় জ্ঞান ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা, গণিত ও আধুনিক জ্ঞানেও দক্ষ হবে।
পীরগঞ্জের ২০২৬ সালের দাখিল ফলাফল তাই নিছক একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। ৫২টি মাদ্রাসার ১ হাজার ১২০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২২১ জনের পাস এবং ১০টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল—এই চিত্রকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এখন প্রয়োজন দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা নয়, বরং জবাবদিহি, তদন্ত ও সংস্কারের সমন্বিত উদ্যোগ।
মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনতেই হবে। কারণ একটি মাদ্রাসার দুর্বল ফলাফল শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, অভিভাবকের স্বপ্ন এবং একটি প্রজন্মের নৈতিক ও শিক্ষাগত ভিত্তি।
—
