ঢাকাFriday , 28 August 2026
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. খেলাধুল
  4. জাতীয়
  5. বিনোদন
  6. বিশ্ব
  7. রাজনীতি
  8. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পুলিশের মামলায় ২৯০ গ্রামবাসী আসামি, পুরুষশূন্য কয়েক গ্রাম

Mahamudul Hasan Babu
August 28, 2026 5:52 am
Link Copied!

নাটোর প্রতিনিধি:নাটোরের গুরুদাসপুরে নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে এক গ্রামের ২৯০ জন গ্রামবাসীকে আসামি করে মামলা হয়েছে। মামলায় ২০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রামজুড়ে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আতঙ্কে কয়েকটি গ্রামের অনেক পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
বুধবার (২৭ আগস্ট) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল হক বাদী হয়ে মামলাটি করেন। সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা ও কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার বাদী এসআই এমদাদুল হক ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান।
দুই শিশুর মৃত্যু, সুরতহাল প্রতিবেদন ঘিরে উত্তেজনা
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) গুরুদাসপুর উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামের নন্দকুঁজা নদীতে গোসল করতে গিয়ে ৮-৯ বছর বয়সী দুই শিশু লাম ও ফারহান পানিতে ডুবে মারা যায়। খবর পেয়ে অপমৃত্যু মামলার তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল রাকিব হাসান ঘটনাস্থলে যান।
পুলিশ প্রথমে নিহত লামের বাড়িতে তার মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পরে চন্দ্রপুর ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে নিহত ফারহানের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। ওই মাঠেই দুই শিশুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, জানাজা শেষে রাত সাড়ে ৭টার দিকে দুই শিশুর মরদেহ অভিভাবকদের কাছে লিখিতভাবে হস্তান্তর এবং বিষয়টি থানায় লিখিতভাবে অবহিত করার প্রস্তাব দেন এসআই আবুল বাশার। এ সময় সেখানে উপস্থিত লোকজন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল রাকিব স্থানীয় একটি দোকানে আশ্রয় নেন। এ সময় অভিযুক্তরা দোকানটি ঘিরে তাঁদের গালিগালাজ করতে থাকেন। পরে রাত ৮টা ১০ মিনিটের দিকে পুলিশ সদস্যরা দোকান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের ওপর বাঁশের লাঠি, কাঠের বাটাম ও লোহার রড দিয়ে হামলা করা হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নিলেও সেখানেও তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল রাকিব হাসান আহত হন।
অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে উদ্ধার
পুলিশের ওপর হামলার খবর পেয়ে গুরুদাসপুর থানার এসআই এমদাদুল হক অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পরে আহত দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা পর আহত এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল রাকিব হাসানকে গুরুদাসপুর থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।
এর এক দিন পর পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
২৯০ জন আসামি, গ্রামে গ্রেপ্তার আতঙ্ক
মামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে আসামি করায় শ্যামপুরসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মামলায় নাম না থাকলেও অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অনেক পুরুষ বাড়িঘরে থাকছেন না। ফলে কয়েকটি গ্রামে অনেকটা পুরুষশূন্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শ্যামপুর এলাকার গৃহবধূ আকলিমা আক্তার বলেন, দুই শিশুর মৃত্যুতে এমনিতেই পুরো এলাকায় শোকের পরিবেশ ছিল। জানাজার সময় ঘটনাটি নিয়ে হঠাৎ উত্তেজনা তৈরি হয়। এখন মামলার পর সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল হামিদ বলেন, দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গ্রামের মানুষ শোকাহত ছিলেন। পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের ভুল বোঝাবুঝি থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে মামলায় এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আসামি করায় সাধারণ গ্রামবাসীর মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়দের বক্তব্য, কাফনের কাপড় সরানো নিয়ে আপত্তি
স্থানীয়দের দাবি, দুই শিশুর জানাজার সময় পুলিশ সদস্যরা কাফনের কাপড় সরিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগ নেন। এ সময় উপস্থিত স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের তর্কাতর্কি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা মারধরের শিকার হন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপমৃত্যু মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে আইন অনুযায়ী মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ করা হচ্ছিল। দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগেই মামলা করা হয়েছে।পুলিশের বক্তব্য
মামলার বাদী গুরুদাসপুর থানার এসআই এমদাদুল হক বলেন, “গতকাল রাতে ডিউটি থেকে ফিরে থানায় এজাহার জমা দিয়েছি। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, “আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আলম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও হামলার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় এলাকায় শোক ও উত্তেজনা—দুই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিপুলসংখ্যক মানুষকে আসামি করায় নিরপরাধ গ্রামবাসী যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।