আফজাল হোসেন চাঁদ, ঝিকরগাছা : যশোরের ঝিকরগাছা সরকারি এম.এল. মডেল হাই স্কুল মোড়ে পথচারীদের বিশ্রামের জন্য পৌরসভার উদ্যোগে নির্মিত ‘নজরুল মঞ্চ’ এখন শুধু বসার স্থান নয়, বরং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নান্দনিক স্মারক। পথচারীদের বসার জন্য নির্দিষ্ট পরিসর নিয়ে গড়ে তোলা এই মঞ্চের পেছনের দেয়ালে স্থান পেয়েছে বাংলা সাহিত্যের তিন বরেণ্য কবির প্রতিকৃতি পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ব্যস্ত ঝিকরগাছা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে নির্মিত এ মঞ্চ পথচারীদের কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। পাশাপাশি এর দেয়ালে তিন কবির প্রতিকৃতি স্থাপন করায় সাধারণ মানুষের সামনে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে নান্দনিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে স্থাপনাটি শুধু নাগরিক সুবিধার একটি অংশ নয়, বরং শহরের সাংস্কৃতিক সৌন্দর্যেরও একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। ‘নজরুল মঞ্চ’-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর পেছনের দেয়ালে অঙ্কিত তিন কবির প্রতিকৃতি। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তাঁর সাহিত্যকর্মে বাংলার গ্রামীণ জনজীবন, প্রকৃতি, মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে বাংলার মাটি ও মানুষের গভীর সম্পর্ক। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী অবস্থান বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা। তাঁর নামে নির্মিত ‘নজরুল মঞ্চে’ তাঁর পাশাপাশি অন্য দুই বরেণ্য কবির প্রতিকৃতি স্থাপন করায় বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার একটি সুন্দর সম্মিলন ঘটেছে। অন্যদিকে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তনসহ তাঁর সাহিত্যিক অবদান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই দেয়ালে বাংলা সাহিত্যের এই তিন মহীরুহের উপস্থিতি তাই কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়, এর মধ্যে রয়েছে সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের বরেণ্য সাহিত্যিকদের পরিচয় তুলে ধরার একটি সুন্দর প্রয়াস। বিশেষ করে ‘নজরুল মঞ্চ’-এর পাশেই রয়েছে ঝিকরগাছা সরকারি এম.এল. মডেল হাই স্কুল, পৌর সদরের গোরস্থান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সময় শিক্ষার্থী সহ পথচারীদের চোখে পড়ে তিন কবির প্রতিকৃতি। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি এ ধরনের দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক উপস্থাপন শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মধ্যে সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে।একজন পথচারী এখানে বসে যেমন বিশ্রাম নিতে পারেন, তেমনি কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে থাকা কবিদের প্রতিকৃতির মাধ্যমে নিজের সাহিত্যিক ঐতিহ্যের কথাও স্মরণ করতে পারেন। এভাবেই একটি সাধারণ নাগরিক স্থাপনা ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, ব্যস্ত শহরে পথচারীদের জন্য এমন বসার স্থান প্রয়োজনীয়। তার সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিষয় যুক্ত থাকায় ‘নজরুল মঞ্চ’ আরও অর্থবহ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এর নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এটি ঝিকরগাছার অন্যতম নান্দনিক স্থান হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে। স্থাপনাটির সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব ধরে রাখতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আগাছা অপসারণ, বসার স্থান সংস্কার এবং দেয়ালে স্থাপিত কবিদের প্রতিকৃতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনসাধারণকেও স্থাপনাটিকে নিজেদের সম্পদ মনে করে এর সৌন্দর্য রক্ষায় দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু প্রশস্ত সড়ক, ভবন কিংবা আলোকসজ্জায় সীমাবদ্ধ নয়। সেই শহরের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রকাশও শহরের পরিচয়ের অংশ। সেই বিবেচনায় ঝিকরগাছার ‘নজরুল মঞ্চ’ নাগরিক সুবিধার সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি সুন্দর সমন্বয় তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে কবি, গীতিকার, গল্পকার, শিশুতোষ লেখক, নাট্যকার ও অনুবাদক টিপু সুলতান বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সামনে আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয় ঐতিহ্যও তুলে ধরতে হয়। আমাদের বিদ্যালয়ের পাশে নজরুল মঞ্চে পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতিকৃতি স্থাপন নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর ও শিক্ষণীয় উদ্যোগ। প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা এসব মহান কবির প্রতিকৃতি দেখছে এটি তাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গেও পরিচিত হোক। নজরুল মঞ্চটি সেই সুযোগ তৈরিতে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এমন স্থাপনা শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং শিক্ষার্থীদের মনে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক দেবাংশু বিশ্বাস বলেন, নজরুল মঞ্চ নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ব্যস্ত শহরে পথচারীদের জন্য কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং একই সঙ্গে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। এর সঙ্গে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে যুক্ত করার চিন্তা থেকেই তিনজন বরেণ্য কবির প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে। আমরা চাই, মানুষ এখানে কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি আমাদের মহান কবিদের সম্পর্কেও জানতে আগ্রহী হোক। তিনি আরও বলেন, জনসাধারণের জন্য নির্মিত যেকোনো স্থাপনার সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে নিয়মিত পরিচর্যার ওপর। নজরুল মঞ্চের পরিবেশ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। স্থানীয় মানুষও যদি এটিকে নিজেদের সম্পদ মনে করে এর সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় সহযোগিতা করেন, তাহলে স্থাপনাটি দীর্ঘদিন মানুষের উপকারে আসবে এবং ঝিকরগাছার সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
