ঢাকাMonday , 31 August 2026
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. খেলাধুল
  4. জাতীয়
  5. বিনোদন
  6. বিশ্ব
  7. রাজনীতি
  8. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৬২ বিঘা সম্পদ, তবুও জরাজীর্ণ মন্দির! আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, কমিটির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

Mahamudul Hasan Babu
August 31, 2026 3:38 pm
Link Copied!

সবুজ হোসেন, নওগাঁ: নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার কাঁটাবাড়ি শ্রীশ্রী জয়দুর্গা মাতা ও রাধাগোবিন্দ জিউ মন্দির। স্থানীয়দের দাবি, মন্দিরের নামে রয়েছে প্রায় ৬২ বিঘা জমি। এসব জমি থেকে প্রতিবছর ধান-ফসলসহ বিভিন্নভাবে আয় হলেও দীর্ঘদিনেও মন্দিরের অবকাঠামোগত তেমন উন্নয়ন হয়নি। বরং মন্দিরের বিভিন্ন স্থাপনা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
মন্দিরের জমির ফসল, বর্গাচাষিদের কাছ থেকে পাওয়া ধান এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কমিটি নিয়ে বিরোধ, নতুন কমিটি গঠনের পরও দায়িত্ব হস্তান্তর না করা এবং মন্দিরের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে মন্দির এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় মন্দিরের বিভিন্ন স্থাপনায় জরাজীর্ণতার ছাপ স্পষ্ট। স্থানীয়দের ভাষ্য, মন্দিরের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি থাকার পরও সেই তুলনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। একটি ভবন নির্মাণের কাজ চলমান থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১৭ বছর ধরে নির্মাণকাজ চললেও এখনো তা শেষ হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মন্দিরের নামে থাকা জমিগুলো বিভিন্ন বর্গাচাষির মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়। তবে কয়েকজন বর্গাদার প্রতিবছর নির্ধারিত পাওনা পুরোপুরি পরিশোধ না করে সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জমি চাষ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে মন্দিরের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া বর্গাদারদের দেওয়া ধান বাজারমূল্যে বিক্রি না করে মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষের ভাইয়ের আড়তে নেওয়া হয় এবং তুলনামূলক কম দামে বিক্রি দেখিয়ে পরবর্তীতে মন্দিরের কোষাগারে টাকা জমা করা হয় এমন অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ধান বিক্রির ক্ষেত্রে বাজারমূল্য, বিক্রয়মূল্য ও কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মন্দিরের বিপুল সম্পত্তি ও প্রতিবছরের আয় থাকলেও আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না। ফলে মন্দিরের জমি থেকে কত আয় হচ্ছে, কী পরিমাণ ধান বা অর্থ পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে মন্দির পরিচালনা কমিটি নিয়েও তৈরি হয়েছে বিরোধ। স্থানীয়দের কাছ থেকে এসব অভিযোগ বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের পত্নীতলা উপজেলা শাখার নজরে এলে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে দাবি করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের পত্নীতলা উপজেলা শাখা পূর্বের কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন করে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাইকিং করে ডেকে এনে তাদের উপস্থিতিতে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। তবে নতুন কমিটি গঠনের প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও পূর্বের কমিটি এখনো তাদের কাছে মন্দিরের দায়িত্ব, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আয়-ব্যয়ের হিসাব হস্তান্তর করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নতুন কমিটির সদস্যদের মন্দিরের দায়িত্ব গ্রহণে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর সংগঠনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে পূর্বের কমিটি বাতিল করে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু নতুন কমিটির কাছে এখনো দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে নতুন কমিটির সদস্যরা বলছেন, মন্দিরের সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পদ। তাই মন্দিরের জমি, ফসল ও আয়-ব্যয়ের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের পত্নীতলা উপজেলা শাখা কর্তৃক গঠিত নতুন কমিটির সভাপতি দেবাশীষ রায় বলেন, “মন্দিরের সম্পদ আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। আর কতদিন তারা এভাবে এই সম্পদকে কুক্ষিগত করে রাখবে? আমরা চাই প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দ্রুত মন্দিরের সুদিন ফিরবে।”
তিনি জানান, মন্দিরের সম্পত্তি ও আয়-ব্যয়ের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং নতুন কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আইনি পদক্ষেপ চেয়ে নতুন কমিটির পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরের সম্পদ ও আয়-ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি মন্দিরের নামে থাকা জমির প্রকৃত পরিমাণ, জমি থেকে প্রাপ্ত আয়, বর্গাচাষিদের সঙ্গে চুক্তি, ফসল বিক্রির হিসাব এবং গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পূর্বের কমিটির সভাপতি ও কয়েকজন সদস্য। তাদের দাবি, মন্দিরের সম্পদ ও আয়-ব্যয় নিয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা অসত্য ও ভিত্তিহীন। কমিটির বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা। তাদের বক্তব্য, মন্দিরের জমি, ফসল ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয়নি।
পূর্বের কমিটির সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, মন্দিরের উন্নয়ন ও পরিচালনার বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। নতুন কমিটি গঠন ও দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
এ অবস্থায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবি, মন্দিরের সম্পত্তি ও আয়-ব্যয়ের বিষয়ে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মন্দিরের নামে থাকা জমির প্রকৃত পরিমাণ, জমির খাজনা ও মালিকানাসংক্রান্ত নথি, বর্গাচাষিদের সঙ্গে চুক্তি, ফসলের পরিমাণ, বিক্রয়মূল্য এবং গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দ্রুত মন্দির পরিচালনা নিয়ে চলমান বিরোধের অবসান হবে এবং মন্দিরের সম্পদ সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে জরাজীর্ণ স্থাপনাগুলোর সংস্কার এবং দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ থাকা ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ করে মন্দিরের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।