গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : গোপালগঞ্জে কোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা ভাতা প্রাপ্তির অযোগ্য হয়েও নিয়ম বহির্ভূত হয়ে নিয়মিত প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভাতা, ভাতা গ্রহণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা কার্যালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে প্রকৃত ভাতা প্রাপ্যদের বঞ্চিত করে দিনের পর দিন এই অনিয়ম চলে আসছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
জানা গেছে, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পের আওতায় অসহায়, দরিদ্র, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের
আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে এ ভাতা দেওয়া হয়। গোপালগঞ্জ সদরের সাতপাড়, করপাড়া ও জালালাবাদ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মের বাইরে থাকা ব্যক্তিরা এ সুবিধার আওতায় ভাতা গ্রহণ করছেন।
রোববার সরেজমিনে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সাতপাড় ও করপাড়া ইউনিয়নে পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতা মেলে।
সমাজ সেবা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাতপাড় ইউনিয়নে বর্তমানে ৬১৮ জন প্রতিবন্ধী, ৩৯২ জন বিধবা ও ১১৮৩ জন বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। এ ইউনিয়নে বিধবা ভাতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা মানা হলেও প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভাতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি।
সাতপাড় দীননাথ গোয়ালি চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী সুজিত বালা প্রতিবন্ধী না হয়েও পাচ্ছেন প্রতিবন্ধী ভাতা। ওই ইউনিয়নের সাবেক সংরক্ষিত নারী সদস্য সারতি বিশ্বাসের দুই ছেলে সাতপাড় উত্তর পাড়ার পল্টন বিশ্বাস ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক পল্লব বিশ্বাস ও এক মেয়ে প্রতিমা বিশ্বাস অর্থাৎ একই পরিবারের তিনজন পাচ্ছেন প্রতিবন্ধী ভাতা।
বর্তমানে ভারতে বসবাস করছেন সাতপাড় উত্তরপাড়ার সুভাষিনী বিশ্বাস, একই গ্রামের রীনা বিশ্বাস, গ্যারেজ মিস্ত্রি সজল কান্তি বিশ্বাস, বাজার এলাকার ভবানী বিশ্বাস, যাত্রাশিল্পী সাগরিকা মন্ডল, ৪ নং ওয়ার্ডের দিলীপ মন্ডলের ছেলে রুবেল মন্ডল, ঠাকুর বিশ্বাসের ছেলে স্বপন বিশ্বাস, উত্তরপাড়ার সন্তোষ বিশ্বাসের মেয়ে অর্পনা বিশ্বাস, মনু বিশ্বাস, সুভাষ বিশ্বাসের মেয়ে ইতি বিশ্বাস ও স্বপন বিশ্বাসের স্ত্রী পাখি রানী বিশ্বাস স্বামী-স্ত্রী দুজনে একই সাথে পাচ্ছেন প্রতিবন্ধী ভাতা। এছাড়া সাতপাড় ১ নং ওয়ার্ডের কৃষ্ণপদ বিশ্বাসের ছেলে বাবু বিশ্বাস, জয়দেব কীর্তনীয়ার ছেলে হিটু কীর্তনীয়া ও সত্য রঞ্জনের ছেলে আনসার ভিডিপি সদস্য রামকৃষ্ণের নামও রয়েছে এ তালিকায়। বাস্তবে মূলত এরা কেউই প্রতিবন্ধী নন। সম্পূর্ণ সুস্থ সবল মানুষ হয়ে পাচ্ছেন প্রতিবন্ধী ভাতা।
অপরদিকে, সাতপাড় ৪ নং ওয়ার্ডের (অব.) উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুশীল বর ও তার স্ত্রী (অব.) স্বাস্থ্য সহকারী রেবা বর দুজনেই পাচ্ছেন বয়স্ক ভাতা।
কোনো পেনশন ভোগী ব্যক্তি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক ভাতা প্রাপ্য হবেন না, কঠোর নিয়ম থাকা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।
সাতপাড় ইউনিয়ন ছাড়াও পার্শ্ববর্তী করপাড়া ইউনিয়নে গিয়েও একই চিত্র চোখে পড়ে।
সম্প্রতি, পশ্চিম গোপালগঞ্জের করপাড়া এক বিধবা নারীকে ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে টাকা আনতে গিয়ে জনরোষে পড়েন ইউনিয়ন সমাজকর্মী পবিত্র বিশ্বাস। পরে সেখান থেকে পালিয়ে তিনি কোনোরকম জীবনে রক্ষা পান। এমন একটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে নেটিজেনের মধ্য প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। জানা গেছে, বিপুল বিশ্বাস করপাড়া ইউনিয়নে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবন্ধী ভাতা ও বয়স্ক ভাতা নির্বাচনে ওই ইউনিয়নেও রয়েছে অনিয়মের পাহাড়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতপাড় ইউনিয়নের প্রতিবন্ধী ভাতা প্রাপ্ত এক ব্যক্তি জানান, সংরক্ষিত মহিলা মেম্বারের সহযোগিতায় ইউনিয়ন সমাজকর্মী নিপু আক্তারের যোগসাজশে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি ভাতা প্রাপ্ত হয়েছেন। প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভাতা প্রাপ্তদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ওই পরিমাণ টাকা নেওয়া হয়েছে। ফলো প্রতিবন্ধী ভাতা প্রাপ্তদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ প্রকৃত প্রতিবন্ধী। আর বাদবাকি টাকা দিয়ে ভাতা প্রাপ্তির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, বয়স্ক ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও করা হয়েছে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি। তবে বিধবা ভাতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সঠিক হয়েছে।
এদিকে, ব্যাপক অনিয়ম ও অভিযোগ থাকার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কর্তব্যে অবহেলা ও যথাযথ তদারকি না করায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে সচেতন মহল মনে কবেন।
অভিযুক্ত ইউনিয়ন সমাজ কর্মী নিপু আক্তার ও পবিত্র বিশ্বাসের সাথে মোবাইল ফোনে এ ব্যাপারে জানার জন্য বারবার কল করলেও তারা কেউই ফোন ধরেননি।
গোপালগঞ্জের উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন আক্তারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোথাও কোনো অনিয়ম ও কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
