সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের বৈশাকান্দী রাবার ড্যামসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী সোনাই নদী (যা স্থানীয়ভাবে বাইরঙ্গ নদী নামে পরিচিত) এখন বালু খেকোদের দখলে। ২০২৪ সালের পর থেকে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অশুভ চক্রে পড়ে নদীটি যেন আজ তিলে তিলে তার অস্তিত্ব হারাচ্ছে। দিন-রাত শত শত ড্রেজার ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের মাধ্যমে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে বৈশাকান্দী রাবার ড্যামসহ নদীপাড়ের একাধিক গ্রাম।
স্থানীয় তথ্যানুসারে, সোনাই নদী থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ হাজার ঘনফুট বালু অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে। বর্তমান বাজারে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় সাড়ে সাত লাখ (৭,৫০,০০০) টাকা। গত প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এই নদী থেকে নিয়মিত বালু তোলা হলেও সরকারের কোষাগারে জমা পড়েনি এক টাকাও। ফলে এই সময়কালে আনুমানিক ১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকারও বেশি বিশাল পরিমাণ রাজস্ব হারিয়েছে সরকার, অপরিকল্পিতভাবে নদী খুঁড়ে বালু তোলায় নদীর তলদেশে সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্তের, যা যেকোনো সময় বৈশাকান্দী রাবার ড্যামের বাঁধ ধসিয়ে দিয়ে বিশাল এলাকা প্লাবিত করতে পারে। বালু তোলার প্রচণ্ড শব্দের চাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবন। বিকট শব্দ আর ড্রেজারের কাঁপুনিতে নদীর দুপাশের বসতবাড়ি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
বৈশাকান্দী এলাকার এক ক্ষুব্ধ ও ভীতসন্ত্রস্ত বাসিন্দা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন:- দীর্ঘ দুই বছর ধরে এখানে রাত-দিন বালু তোলা হচ্ছে। সারা রাত মেশিনের গর্জন আর শব্দে আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না। আমাদের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ভয় আতঙ্কে দিন কাটায়। নদীর বুক যেভাবে কাটা হচ্ছে, যেকোনো দিন আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। কোথাও জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সরাসরি অভিযোগে অবৈধ এই বালু মহালের নেপথ্যে ইসলামপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সুফি আলম সোহেল এবং মামুদুল হাসানের নাম উঠে এসেছে। এ ছাড়া বালু উত্তোলন, নৌকা চালনা ও কেনাবেচায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে স্থানীয়ভাবে আরও কয়েকজনের নাম চাউর হয়েছে:- মিলন মিয়া (পিতা: আরফা আলী, বৈশাকান্দী, ছাতক) চান মিয়া চান্দু (পিতা: মৃত মো. কাশিম আলী, বৈশাকান্দী, ছাতক) মখলিছ মিয়া (পিতা: আব্দুল করিম, ছনবাড়ী, ছাতক) আব্দুল লতিব বিরাই (পিতা: আইয়ুব আলী, ছনবাড়ী, পশ্চিম ইসলামপুর) আব্দুর রহিম (পিতা: আব্দুল মুনাফ, জালিয়ারপাড়, কোম্পানীগঞ্জ)
তবে এসব অভিযোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন, ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুফি আলম সোহেল অবৈধ বালু উত্তোলনের সাথে নিজের জড়িত থাকার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
কোম্পানীগঞ্জের আব্দুর রহিম দাবি করেন, আমি এসব কাজে জড়িত নই। ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুফি আলম সোহেলের মাধ্যমেই মূলত বালু উত্তোলন হয়। আবার অভিযুক্ত মখলিছ মিয়া জানান, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি হয়তো জড়িত, কিন্তু আমাদের বিষয়ে যে অভিযোগ উঠছে সে সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না।
অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মুহি উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সুনামগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল নিশ্চিত করে জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যেই আমাদের নজরে এসেছে। পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে এর সাথে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ছাতক নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ অরবিন্দু বলেন, আমরা সংবাদ পাওয়া মাত্রই ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছি। পুরো বিষয়টি এখন আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।
সিলেট বিভাগীয় নৌ পুলিশ সুপার ফাল্গুনী পুরকায়স্থ বলেন, নদীতে কোনোভাবেই অবৈধ বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না। নৌ পুলিশ সদস্যদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে সোনাই নদীতে অবৈধভাবে কোনো বালুবাহী ট্রলার বা ড্রেজার চলাচল করতে না পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জোর দাবি করে জানান শুধু আশ্বাস বা লোকদেখানি অভিযান নয়, দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বালু খেকো সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের গ্রেফতার করে সোনাই নদী ও বৈশাকান্দী রাবার ড্যামকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করা হোক।
